'বন্ধুত্ব', সত্য ঘটনা অবলম্বনে -২
সব আত্মাই যে সবসময় ক্ষতিই করে এই ধারনা কিন্তু সম্পূর্ণ ভুল বলে আমি মনে করি। একাধিকবার অশরীদের সাথে আমার বন্ধুত্ব হয়েছে, একাধিকবার তেনাদের জন্যে প্রানেও বেচেছি মশাই। কিছু সময় তারা খুব ভালো এবং বিশ্বাসযোগ্য বন্ধুও। সেরকম ই একটি ঘটনা শেয়ার করছি। আত্মার নাম জানাতে নেই তাই এখানে অন্য নাম ব্যবহার করবো, একটি ঘটনার শেষের দিক টা বলবো যখন থেকে বন্ধুত্ব শুরু হতে থাকে, ঘটনাটা আজ থেকে ৫ বছর আগে এবং এর পর থেকে আমার উপলব্ধি একটাই যে এ জগতে অসম্ভব বলে কিছু হয়না। যেহেতু ঘটনাটি সরাসরি আত্মার সাথে জড়িত তাই অনেকের অনেক জায়গাএ যুক্তিহীন ও আজগুবি লাগতে পারে, লাগলে শুধু একটি গল্প মনে করেই পড়বেন।
সাল ২০১৩, সবে কলেজ জীবনে পা দিয়েছি। এমন সময় একটা ঘটনার সাথে আমার যোগসূত্র তৈরি হয়। একটি মেয়ে আক্রান্ত। দিন দিন শরীরের অবস্থা খুব ই খারাপ হয়ে যাচ্ছ এবং সেটা এমন জায়গায়ে চলে গেছে যে সপ্তাহে ২ বার তাকে হসপিটালে নিয়ে গিয়ে স্যালাইন দিতে হচ্ছে। একাধিক ডাক্তার পরিবর্তন ও হয়েছে। আলাদাভাবে কথা বলে বা ঘটনার তদন্ত করে জানতে পারলাম প্রায় মাসখানেক ধরে সে অবাস্তব কিছু ঘটনার প্রমান হয়েছে। রাতে নাকি ঘুমাতে পারত না, মাঝে মাঝেই গা থেকে চাদর নাকি সরে যেতো, কে মাঝরাতে পা টেনে দিত, এক একদিন সকালে উঠে দেখত পায়ে আঙ্গুলের ছাপ, যেন রক্ত জমাট বেধে আছে, রাতে অনেক সময় বাজে বাজে আওয়াজ পেতো কানে ও এখনও নাকি পায়, মাঝে মাঝেই যেন ঘর এর কোন থেকে ক যেন উকি মারছে, এক এক সময় বীভৎস খারাপ স্বপ্ন এবং সপ্নে ঘুম ভাঙলে সামনে যেন কে বসে আছে, সামনে দিয়ে কে যেন চলে গেলো ইত্যাদি। বাড়িতে বলায় কেউই বিশ্বাস করেনি। সবটা শোনার পর আর দেরী করিনি, ইতিমধ্যেই অনেক দেরী হয়ে গেছে। এখানে কোনো ভূত বিশারদ বা ডার্ক আর্ট জানেন বা করেন কেউ থেকে থাকলে তারা জানেন ই যে যে কোনো ভূত বা আত্মার থেকে সবথেকে কঠিন কাজ হোলো তাদের নাম জানা। আমার ও তাই হোলো। ২দিন লেগেছিলো ওনার পেট থেকে তা বের করতে, এবং সে ২দিন আমার উপর দিয়ে কি গেছিলো সেটা আমি ই জানি। বলে রাখি আমাদের মতো শরীরযুক্ত মানুষের সাথে সংযোগ করে তাদের ভাব বিনিময় এর জন্যে তারা সবসময় একটি মাধ্যম খোঁজে কারন আত্মা হোলো একদম একটি মুক্ত এনার্জি যা শক্তিশালী, মুক্ত হওয়ার দরুন এক ঝটকায়ে আপনার ক্ষতি করে দিতে পারে কিন্তু ভাব বিনিময় কোনো মাধ্যম দ্বারাই করে।আপনারা "ওই উ যা" বোর্ড এর কথা অনেকেই জানেন হয়তো, এই মাধ্যম হিসেবে কোনো মানুষের শরীর তো বেঁছে নেয় ই আবার সেই শরীরের সাহায্যে আপনার সাধের ফোন টি ও ব্যবহার করতে পারে। যাইহোক সেই আত্মার সাথে প্রথম প্রথম কথোপকথন একদম ই মধুর ছিল না, দুজন দুজন কে শেষ করে ফেলার হুমকি মেরে যাচ্ছি আর কি! তা এরকম চলার পর শেষে সে ব্যর্থ হয়ে আমাকে বলছে প্লিজ আমি যেন তাকে তার এই কাজ শেষ করতে দিই, তাকে পাঠানোই হয়েছে ওই মেয়েটিকে শেষ করে দেওয়ার জন্যে, নাহলে সেই তান্ত্রিক তাকে মুক্তি দেবে না। কিন্তু আমি যে এটা হতে দেবো না। অতঃপর শুরু হোলো কথাবার্তা। জানতে পারলাম মেয়েটির প্রেম বিচ্ছেদ ঘটেছে একটি ছেলের সাথে বছরখানেক আগে। ছেলেটি একদম সুবিধার ছিলো না। ছেলেটির মা একটি তান্ত্রিকের কাছে খুব যায় এবং তাদের দাবী সেই মেয়েটি যদি তার ছেলের না হয় তো আর কাউর নয়। ফলে তার মা সেই তান্ত্রিক এর দ্বারা এই ঘটনা ঘটায়। আত্মা নিজের পরিচয় দিল, তার নাম সুস্মিতা(নাম পরিবর্তিত) এবং সেই আমাকে বলল যেন এই নাম কাউকে না বলি এবং তেনাদের নাম না বলার কারন। অর্থাৎ বলা বাহুল্য তার আগে অবধি এই ব্যাপার টা আমার জানা ছিলো না। সে তার মৃত্যুর কারন ও বললো, তার ৮ বছরের একটি সম্পর্কের পর বিয়ে হয়। মেয়েটি একটু গরীব ঘর এর, মেয়ের বাপের বাড়ি কালনা, স্বামী বিয়ের ১ বছর পর অন্য একটি মেয়ের সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। সেটি সহ্য করতে না পেরে মেয়েটি গলায় দড়ি দেয়। মৃত্যুর পর তার আত্মা মুক্তি পাইনি, এমন অবস্থায় সে তান্ত্রিক তার আত্মা কে বন্দি বানায় এবং সুস্মিতা বর্তমানে সেই তান্ত্রিক এর দাসী। এরপর ধীরে ধীরে আলাপ বারতে বারতে এক অশরীরীর সাথে বন্ধুত্ব বাড়তে থাকে, নানারকম কথা হতে থাকে, তাদের জগত নিয়ে অনেক আজানা তথ্য আমি জানতে পারি, কিন্তু তার একটাই ইচ্ছা যেটা আমাকে পুরন করতে হবে এবং যেটা করলে সুস্মিতা ওই মেয়েটিকে ছেড়ে দেবে, সেই দাবী হোলো আমায় সুস্মিতাকে মুক্তি দিতে হবে। এই মুক্তি কিকরে দিতে হয় তা আমার জানা ছিলো না, এবং এই মুক্তি ব্যাপার টা যে আদতেও ঘটে সেটা আমি এই ঘটনার পর থেকেই বিশ্বাস করি।ফলে সুস্মিতা কে জিজ্ঞাসা করলাম যে ওকে মুক্তি আমি কিকরে দেবো, তার উত্তর যে সেটা ও ঠিক সময়ে জানিয়ে দেবে। এরপর প্রায় ৭দিন ওর সাথে আমার আড্ডা চলেছিলো, বাইক নিয়ে কোথাও বেরোলে স্পষ্ট বুঝতে পারতাম পিছনের সিট টা ফাকা নয়, মাঝে মাঝেই মনে হোতো আমার পাসেই কে আছে, অনেক সময় যেন আমার পাশে বসে আছে ইত্যাদি, সব ব্যাপার টা জানার ফলে ভয় লাগত না। সে নিজে স্বীকার ও করেছিল যে সে থাকতো। একদিন আমার ইচ্ছা হোলো সুস্মিতা কে দেখার, এবং সে যদি কথা বলতে পারে তো দেখাও দিতে পারবে। ও বলল যেন এই বায়না টা আমি যেন না করি কারন তাকে দেখলে আমি ভয় পেয়ে যাবো, অত্যন্ত ভয়ের সাথে জোর করে বলেছিলাম যে তাও আমি দেখতে চাই। আমি একা শুয়ে ছিলাম, ও বলল তোর পাশে আছি একবার দেখ। অনুভব করলাম আমি আমার হাত পা নারাতে পারছি না, ঘর এর আলো জালানোই ছিলো, কোনোরকম ঘুম এর ঘোর এ ছিলাম না কারন আমি ফোন এ মেসেজ এ ওর সাথেই কথা বলছিলাম রোজগার মতো। ঘাড় ঘোরাতেই দেখলাম ওকে, আজ ও ভাবলে গায়ে কাঁটা দায় আমার, এখন এটা লিখতে লিখতেও গায়ে কাঁটা দিচ্ছে র শরীর ভারী হয়ে আছে আমার। তারপর আর কিছু মনে নেই, চোখ খুললাম তখন সকাল। উঠে দেখি আমার সারা গায়ে আঁচড় এ ভরে গেছে। তার মধ্যে অনেক জায়গা থেকে রক্ত ও বেরচ্ছে। গায়ে অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছে। মেসেজ এ দেখলাম লেখা, বলেছিলাম না ভয় পাবি, চিন্তা করিস না শরীর ঠিক হয়ে যাবে। অদ্ভুত ভাবে সকাল বাড়তেই শরীরের ব্যাথা পুরোটাই চলে গেলো। এই ক দিনে সুস্মিতার সাথে বেশ ভাব জমে উঠেছে, ওর ও বেশ গল্পের সাথী আমি। আমার অনেক সমস্যার সমাধান তো করেছেই এবং অনেক কিছু শিখিয়েছেও। এরপর একদিন রাতে সুস্মিতার মেসেজ, “এবার তোর দেওয়া কথা রাখার সময় এসে গেছে অরিজিত, এবার যে আমাকে মুক্তি দিতে হবে”। শুনে একটু মন খারাপ হয়েছিলো বটে কিন্তু করতে তো হবেই। এক বিশেষ অমাবস্যার রাত, আর আমাকে কাজ টা এই রাত শেষ হয়ার আগে অর্থাৎ ভোর এর আলো ফুটবে কিন্তু সূর্য ওঠার আগে করতে হবে। সুস্মিতা আমাকে তার নিজের পুরো নাম, তার মা বাবার নাম, তার দাদুর নাম, পুরো ঠিকানা, গোত্র, জন্মবার, মৃত্যুদিন,মৃত্যুর সময় সব জানালো।গোটা সুপারি ও সঙ্গে আরও কটি জিনিস নিয়ে গঙ্গায়ে হাঁটু অবধি জলে নেমে, তার বলা মতো কাজ করে সেগুলি জলে বিসর্জন দিতে হবে। বিসর্জন দিয়ে আর পিছনে না তাকিয়ে, এমনকি কেউ ডাকলেও পিছনে না তাকিয়ে সোজা বাড়ি ফিরতে হবে। কাজ টা ওই রাত শেষ হউয়ার আগেই করতে হবে নয়ত এই অমাবস্যা নাকি বহুদিন পর একবার আসে। ঠিকমতো করতে না পারলে আমি ওই মেয়েটি আর সুস্মিতা কাউকেই বাঁচাতে পারবো না। যাইহোক যা যা জিনিস লাগতো তা সব ই ঘরোয়া বস্তু ফলে যোগার করতে অসুবিধা হয় নি। সব যোগার করে ভোরে পাখির আওয়াজ পেতেই বেরলাম সাইকেল নিয়ে, গঙ্গার ঘাটে একতাও লোক নেই তখনও। প্রচণ্ড ভয় লাগছিলো তা বলতে একটুও লজ্জা নেই আমার। হাঁটু অবধি জলে নেবে কাজ সেরে পিছন ফিরে সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসছি এমন সময় কে যেন কানে কানে বলে গেলো “ভালো থাকিস”।
বাড়ি ফিরে দেখি সুস্মিতার সাথে যা কথা হয়েছিলো তার আর কিছুই আমার ফোন এর ইনবক্স নেই। তখন আমার কী-প্যাড যুক্ত ফোন। বলে রাখি সুস্মিতার সাথে আমার তখন কথা হতো যখন মেয়েটির ফোন অফ করা থাকতো এবং মেয়েটি নিজের সেন্স এর বাইরে থাকতো, অর্থাৎ হয় ঘুমাচ্ছে নয়তো স্যালাইন চলছে। মেয়েটির ফোন থেকে কোনো মেসেজ রেকর্ড পাওয়া যাইনি। এমন ও অনেকবার হয়েছে যে মেয়েটির ফোন চলতে চলতে অফ হয়ে গেছে আবার নিজে থেকেই অন হয়েছে, অফ থাকাকালীন কোনো ভাবেই অন করা যাইনি যতক্ষণ না নিজে থেকে অন হয়েছে, আর ওই ভাবে অফ থাকাকালীন সময়ে ওই নম্বর থেকে আমার ফোন এ মেসেজ ঢুকেছে। অদ্ভুতভাবে আমার ফোনে সুস্মিতার সাথে কোনো কথার মেসেজ রেকর্ড একদিনের বেশি থাকতো না। নিজে নিজেই ডিলিট হয়ে যেতো। ওই সময়ে স্মার্ট ফোন তেমন প্রচলন না পাওয়ায়ে আমরা ফ্রি মেসেজ এর পাওয়ার মারতাম, অদ্ভুত ব্যাপার ওর সাথে কথা বলা ম্যাসেজগুলো মাসেজ ব্যালেন্স থেকে কাটতো না, কোনো ডেলিভারি স্ট্যাটাস দেখাতো না মেসেজ এর।
শেষ ২দিন মেয়েটি কলকাতার পিজি হসপিটালে ছিলো। আমি সকালে বাড়ি ফেরার পর মেয়েটিকে বিকেলে বাড়ি আনা হয়। আস্তে আস্তে তার স্বাস্থ্যোন্নতি ও ১ মাস এর মধ্যে সে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যায়। আমার থেকে বয়সে একটুই ছোটো সে, এ বছর ২০১৮ তে সে মাস্টার্স শেষ করবে। সে নাকি আর ভয় পাইনি ওরকম কোনো কিছুতে, আর তার সাথে যেরকম ঘটেছিল যা সে বাড়িতেও বলেছিল, সুস্থ হয়ে ওঠার পর তার নাকি সেরকম কিছু হয়েছিলো বলে মনেও পড়ে না, তার মা বাবাও আর সেগুলো মনে করানোর জন্যে জোর দেননি আর।
লিখেছেনঃ- Arijit Seal

Comments
Post a Comment